Social Icons

Friday, 21 December 2012

মেধার কুদৃষ্টিঃ সম্পূর্ণ

 
 
আমি এখানে শ্রেণী বৈষম্যের কথা বলছি না। আমি বলছি মেধা বৈষম্যের কথা। আমি মেধা বৈষম্যটাকে আরো বিস্তারিত আলোচনার জন্য ছাত্রছাত্রীদের ৩ ভাগে ভাগ করব। প্রথম ভাগে আমি রাখবো যারা সারাক্ষণ পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে এবং নিজেদের মধ্যে একটা প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করে কে কার চাইতে কত ভাল ফলাফল করতে পারবে। দ্বিতীয় ভাগে আমি রাখবো যারা পড়ালেখায় তেমন একটা মনযোগী না এবং সবশেষে তৃতীয় ভাগ। যাদেরকে আমি বলবো তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রছাত্রী, এরা মোটামুটি টাইপের পড়ালেখা করে এবং ফলাফলের দিক থেকে প্রথম ভাগের ছাত্রছাত্রীদের রাজত্ব মেনে নেয়। এবং তারা সবসময় মনে করে তাদের দ্বারা যা করছে তাই সম্ভব আর ভাল করা যাবে না। এই হল ৩ ধরণের ছাত্রছাত্রী। এবার আসুন এদের মাঝে বৈষম্যটা কোথায় তা দেখি।
 
বৈষম্যটা হল এই ৩ ভাগের ছাত্রছাত্রীদের প্রতি শিক্ষকদের দৃষ্টিকোণ। আমাদের শিক্ষকরা এই তিন ধরণের ছাত্রছাত্রীদের প্রতি তিন ধরণের আচরণ করেন। প্রথম শ্রেণীর প্রতি তাদের আচরণ এবং দৃষ্টিকোণ অনেক সুন্দর এবং ভালো থাকে। আমি নিজে একটা জিনিস অনুভব করতাম, কোন টিচার যদি আমাকে দেখলে আমার নাম ধরে দেকে যে কোন খোঁজ খবর জিজ্ঞেস করতে তখন আমার ওই টিচারের প্রতি সম্মান এবং ভালোবাসা দুইটাই বেড়ে যেত। আর সাথে বাড়ত ওনার বিষয়ের উপর বিশেষ মনযোগ। কারণ ওনার বিষয়ে পারদর্শী হতে না পারলে আমি আমার অবস্থানটা তার কাছ থেকে হারাবার একটা ভয় থেকে যায়। তাই আমাদের সমাজে ভালো ছাত্রছাত্রীদের প্রতি এরকম বন্ধুসুলভ দৃষ্টিকোণ থাকেই। তবে হ্যাঁ এক্ষেত্রে মাঝে মাঝে একটু সমস্যা থাকে। স্কুলে থাকতে যদি কোন টিচার ভালো ছাত্রছাত্রীদের দোহাই দিয়ে ও সব পারে/ পারবে বলে তার প্রতি আর কোন খেয়াল না রাখে তবে সে খেত্রেও সমস্যা আছে। তখন দেখা যাবে স্কুলে ভালোভাবে পার হয়ে গেলো পরের ধাপে ওইভাবে পার নাও হতে পারে। এ গেলো ১ম ভাগের ছাত্রছাত্রীদের প্রতি টিচারের আচরণ।
 
এবার আসি ২য় ভাগের ছাত্রছাত্রী। এদেরকে টিচারদের মনোভাব বরাবরি একি থাকে। আর টিচাররা এদেরকে সবার আগে মার্ক করতে পারেন। মার্ক করতে পারাটা একটা ভালো দিক। কিন্তু সমস্যাটা হয় তখনি যখন তারা যে ৩য় ভাগের ছাত্রছাত্রী আর সে জন্য তাদেরকে দিয়ে ভালো কিছু আশা করা যাবে না এ চিন্তা ভাবনাটা টিচারদের মধ্যে কাজ করে যখন। আমাদের টিচাররা সবসময় তাদেরকে ওই দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখে যে তারা খারাপ ছাত্র এবং তারা কিছু পড়লেও কি না পড়লেও বা কি হবে। কিন্তু তাদের যে মেধার বিকাশ যথাযথ ভাবে হয় নাই, তাদের যে একটু অতিরিক্ত যত্নের দরকার, তাদের মেধার বিকাশের একটা আলাদা পরিবেশ দরকার হয় তা খুব একটা কেও চিন্তা করে না বলে আমার ধারণা। যার ফলে এই ৩য় ভাগের ছাত্রছাত্রীরা সবসময় ৩য় ভাগেই পড়ে থাকে। এদের আর উন্নতি হয় না। তবে হ্যাঁ, হয়ত ভালো পরিবেশ পেলে কিংবা ভালো সুযোগ পেলে তারাও হয়ত ভালো কিছু করতে পারবে আমার ধারণা এবং বিশ্বাস।
 
এবার আসি ৩য় ভাগ বা ৩য় শ্রেণী। এরা আমার মতে সবচাইতে অবহেলিত। আমি আগেও বলেছি এরা সবসময় নিজেদেরকে লুকিয়ে রাখতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। এরা নিজে থেকে কিছু বলে না , বলার চেষ্টাও করে না। এদের অবস্থা এমন, ভালো এবং খারাপের মাঝে পড়ে এরা দিন দিন টিচারদের থেকে দূরে সরে যায়। তাছাড়া টিচাররাও তাদেরকে চিনার খুব একটা চেষ্টাও করে না। কিন্তু যা করে সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায়। এদের মেধার বিকাশের যথেষ্ট সুযোগ থাকে, কিন্তু এদের নিজেদের লুকিয়ে রাখার মনভাবের জন্য কিছুই করতে পারে না। আমাদের টিচারদের উচিৎ এদেরকে খুঁজে বের করা এবং এদেরকে মেধার প্রকাশের সুযোগ করে দেয়া। কিন্তু আবারো একি প্রশ্ন এসে যায় আরেকজনের ছেলেমেয়ে নিয়ে চিন্তা করে আমার কি লাভ?
যাই হক আর বেশী কিছু বলার নাই। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এই সংস্কৃতিটা চলে আসছে এবং চলতে থাকবে। কারণ শিক্ষকদের মধ্যে ওই মনমানসিকতা না আসবে যে উনি সমাজ গড়ার দায়িত্ব নিছেন , একটা উন্নত জাতি তার মাধ্যমেই হবে ততদিন পর্যন্ত এ মেধা বৈষম্য চলতে থাকবে। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় শিক্ষকদের ভালো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। আমরা কবে একটা উন্নত জাতি পাবো এ আসায় বসে না থেকে কিভাবে জাতিকে উন্নত করা যায় তা নিয়ে ভাবতে হবে। তবেই আমাদের দেশ মেধার কুদৃষ্টি থেকে রক্ষা পাবে।